nobo1

সেফজোনের অর্থ বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিপদজনক, ভয়ংকর ও স্বার্থবিরোধী !!!

নবদ্বীপ নিউজঃ- মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান গণহত্যা নিয়ে বিএনপি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন – রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে যে সেফজোনের কথা ভাবা হচ্ছে, তা হবে বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিপদজনক, ভয়ংকর ও স্বার্থবিরোধী। এর পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে চাপ সৃষ্টি করতে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির উপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

রোববার, সেপ্টেম্বর ২৪, বিকেলে রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশো’রে ‘জেনোসাইড ইন মিয়ানমার অ্যান্ড দ্য রোল অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্যদিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত সিরাজুল ইসলাম। প্রবন্ধের মাধ্যম তিনি রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও তাদের ওপর নির্মম গণহত্যা পরিস্থিতি ও করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সেমিনারে বিএনপির নেতারা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পলিটিক্যাল অফিসার জ্যাকব লেভিন এতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমাপনী বক্তব্যে সেমিনারে আলোচকবৃন্দের বক্তব্যের সারমর্ম ও রোহিঙ্গা ইস্যূতে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান করা দুঃখজনক। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। আর এ জন্য জাতীয় ঐক্যের দরকার। বিএনপি এই বিষয়ে অভিজ্ঞ। কারণ, জিয়াউর রহমানের সময়ে ’৭৮ সালে ও বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তখন তাদের ফেরত পাঠিয়ে নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই দায়বদ্ধতা থেকে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে।

জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া না দিয়ে ক্ষমতাসীনরা দলীয় রাজনীতি করতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এই নেতা।তিনি আলোচনার সারমর্ম তুলে ধরে বলেন,এই আলোচনায় সবাই একমত হয়েছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, সেই সরকার রোহিঙ্গাদের উপর যে হামলা চালিয়েছে তা এক কথায় গণহত্যা (জেনোসাইড) এবং মানবিক বিপর্যয়। রোহিঙ্গা জাতীগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে মিয়ানমার সরকার এই গণহত্যা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের উপর বর্বরতাকে সারা বিশ্ব গণহত্যা বলায়, তাদেরকে আলোচকদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

একই সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন খন্দকার মোশাররফ।

প্রস্তাবনাগুলো হলো –

১। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে (মিয়ানমার) প্রত্যাবর্তনের জন্যে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও সমাধানে পুনরায় জাতীয় ঐক্যসৃষ্টির আহবান করছি।

২। রোহিঙ্গারা যারা তাদের ভিটে মাটি ছেড়ে, সহায়-সম্বল ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

৩। মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদেরকে সসম্মানে নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘসহ সকলকে নিয়ে মিয়ানমার সরকারের ওপর যথাযথ কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে করে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

৪। বিএনপি সরকারের অভিজ্ঞতা অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ও ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ‘রিপার্টিশনে এগ্ররিমেন্ট’ এর আলোকে রোহিঙ্গাদের বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা আহবান জানাচ্ছি।”

৫। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সেফজোন সম্পর্কে যে কথা বলেছেন তা পরিষ্কার করার আহ্বান জানান ড. মোশাররফ। তিনি বলেন, সেফ জোন হবে বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গাদের জন্য বিপদজনক, ভয়ংকর ও স্বার্থবিরোধী। আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করছি। এ নিয়ে যেন আর কথা না হয়। সেফ জোন বিষয়টিকে আমরা ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকায় আন্তর্জাতিক মহলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তারা মিয়ানমারের গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্ব দিয়ে এখনও রেজুলেশন নিতে পারেনি। আশা করি, তারা এমন পদক্ষেপ নেবে যাতে মানবিক বিপর্যয় সমাধান হয়।

উদ্বোধনী বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে গণহত্যা চালাচ্ছে। সমগ্র বিশ্ব সোচ্চার হলেও বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। বিএনপির সেমিনারের মূল বিষয় হচ্ছে জনসমর্থন তৈরি করা।

সেফজোন বিশ্বের কোন দেশেই কাজ করেনি – আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সরকার এখন কোন অবস্থানে আছে সেটি পরিষ্কার নয়। এই ধরনের জাতীয় ইস্যূতে সরকার জাতীয় ও বিশ্বকে একত্রিত করলেও এখন উল্টো আমাদের সরকারকে একত্রিত করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এখন কোন অবস্থানে আছে সেটি পরিস্কার নয়। লোক দেখানোর কারনে সরকার অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দাবি, বিশ্বের সবার দাবি রোহিঙ্গারা তাদের দেশে, বাসস্থলে ও গ্রামে ফিরে যাবে।

সেফজোন প্রস্তাবের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, সেফজোন কোথাও কখনও কাজ করে না। আমরা সবাই জানি সেফজোন বসনিয়াতে কাজ করে নাই, রুয়ান্ডায় কাজ করেনাই, শ্রীলংকায় কাজ করে নাই, ইরাকে কাজ করেনি। ইট’স আ ফ্যালাসি।”

প্রধানমন্ত্রী কফি আনানের যে প্রতিবেদনের আলোকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চেয়েছেন তারও সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কফি আনানের রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিফ করেছেন কিনা আমার সন্দেহ হচ্ছে। যদি ব্রিফ করতো তাহলে প্রধানমন্ত্রী এই রিপোর্ট বাস্তবায়নের প্রস্তাব করতেন না।ওই রিপোর্টে কোথাও রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠির কথাই লেখা নেই।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত-চীন-রাশিয়ার বিতর্কিত ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে খসরু বলেন, ‘এই অঞ্চলের যারা বড় শক্তি তারা এক্সক্লুসিভ একটি জাতির পক্ষে কাজ করছেন। যদি ক্ষমতাধররা এই কাজ করেন তবে এটি ভবিষ্যতে ভয়াবহ অবস্থা হবে। এটি শুধু মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। মিয়ানমারের সঙ্গে হওয়া আগের চুক্তিগুলো ভিত্তি ধরে কাজ শুরু করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দিয়ে বার্মিজ সরকারকে বোঝাতে হবে – ড. আবদুল মঈন খান

বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ’৭৮, ’৯২, ২০০৫ সালেও এই সংকট দেখেছি। আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দিয়ে বার্মিজ সরকারকে বোঝাতে হবে রোহিঙ্গারা যতই ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হোক না কেন তাদের নির্মূল করা যাবে না। এটা করা গেলে অনেকাংশে সংকট কমে যাবে। সেফজোনের কথা বলে ছাড় দিলে চলবে না।

বাংলাদেশ সরকাকেও বৈশ্বিকভাবে রাষ্ট্রের শক্তি দেখাতে হবে – আসিফ নজরুল

সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমস্যা উল্লেখ করে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই তা সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আসিফ নজরুল আরও বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার সমাধান করতে হবে। মিয়ানমারকে তাদের নাগরিত্ব ফেরত দিতে হবে এবং তাদের অধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকাকেও বৈশ্বিকভাবে রাষ্ট্রের শক্তি দেখাতে হবে।

বিএনপিকে কর্মসুচি দিতে হবে – মাহমুদুর রহমান মান্না

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই বাড়ছে উল্লেখ করে সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় সরকার ও আন্তর্জাতিক ফোরামের উপর চাপ সৃষ্টি করতে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে কর্মসুচি দেয়ার আহ্বান জানান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঐক্যমতে আসতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পুরো জাতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেরা ঐক্য না করলেও সারাদেশের মানুষ এই ইস্যুতে এক। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বিশেষ করে নারী এবং শিশুরা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে। ৫-১০ বছরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় রয়েছে। এই অবস্থায় একটি দল হিসেবে বিএনপির উচিত তাদের নিজেদেরই একটি কমিটি করে সারা পৃথিবীতে মুভ করা। কফি আনান রিপোর্টটি সারাবিশ্বে তুলে ধরা।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ।

আলোচনায় আরো অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান, জয়নাল আবেদীন, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য রিয়াজ রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নওশাদ জমির বক্তব্য রাখেন।

নাগরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব মোফাজ্জল করীম, খান মো. ইব্রাহিম, সাবেক রাষ্ট্রদূত ইফতেখারুল করীম, মাহমুদ হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাসান তালুকদার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাইদুজ্জামান প্রমূখ রোহিঙ্গা পরিস্থিতির ওপর তাদের পর্যবেক্ষন তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপি সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম, আবদুল হালিম, গোলাম আকবর খন্দকার, ইসমাইল জবিউল্লাহ, আবদুল কাইয়ুম, নাজমুল হক নান্নু, মজিবুর রহমান সারোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, আসাদুজ্জামান রিপন, শামা ওবায়েদ, সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, আসাদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সদরুল আমিন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান, কুয়েত, ইরান, ফ্রান্স, পাকিস্তান, সুইজারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডসহ মোট ১২টি দেশের কুটনীতিকেরা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ইউএনডিপি ও ডেমোক্রেটিক ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিওরা এতে অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>